নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ভিজিএফের চাল বিতরণ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও চাল আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সহায়তার এই চাল প্রকৃত দরিদ্রদের মাঝে বিতরণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা রাজনৈতিক পরিচয়ভিত্তিক বণ্টন করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এদিকে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে হেনস্থার শিকার হয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক। ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাঙ্গুনিয়া প্রেসক্লাব।
প্রায় ১ টন চাল আত্মসাতের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৪ মে অনুষ্ঠিত ভিজিএফ চাল বিতরণ কার্যক্রমে প্রায় ১০০টি কার্ডের সমপরিমাণ প্রায় ১ টন চাল আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরপরই তড়িঘড়ি করে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেন পোমরা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব তাজ উদ্দিন।
তবে সচিবের দেওয়া হিসাব পর্যালোচনা করে একাধিক অসঙ্গতি ও প্রশ্ন সামনে এসেছে।
১১০০ কার্ডের হিসাব, সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাজনৈতিক খাতে
সচিবের উপস্থাপিত তথ্যমতে, মোট ১১০০টি ভিজিএফ কার্ডের বিপরীতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও শ্রেণিভিত্তিকভাবে চাল বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়নের ১২ জন ইউপি সদস্যকে দেওয়া হয়েছে ৩৬০টি কার্ড, যার বিপরীতে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৩৬০০ কেজি চাল।
এছাড়া শ্রমিক ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ৬ জনকে দেওয়া হয়েছে ১৬০ কেজি চাল।
তবে সবচেয়ে বেশি বিতরণ দেখানো হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে। এ খাতে ৬৫০টি কার্ডের বিপরীতে ৬৫০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেখানো হয়।
এ বিষয়ে পোমরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আজিজুর রহমান বলেন,
“আমার কাছে ৬৫০টি কার্ড ছিল। আমি সভাপতি হিসেবে ৩০টি, সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম ২০টি, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক হারুন ১৮টি, যুবদল ১৮টি, উপজেলার জন্য ১৮টি, মহিলা দল ১২টি, ইকবাল মেম্বার ১০টিসহ মোট ৬৫০টি কার্ড দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।”
স্থানীয়দের প্রশ্ন, গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি সহায়তার চাল কীভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বণ্টন করা হলো?
হিসাবেই মিলছে না একাধিক তথ্য
সচিবের দেওয়া তথ্যে আরও কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে।
তথ্যে গ্রাম পুলিশের ৭ সদস্যের নামে ২০টি কার্ডের বিপরীতে ২০০ কেজি চাল বিতরণের তথ্য দেওয়া হয়েছে। অথচ ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত গ্রাম পুলিশের সংখ্যা মাত্র ৭ জন।
একইভাবে বাজার প্রহরীদের জন্য ৪টি কার্ডের বিপরীতে ৪০ কেজি চাল বরাদ্দ দেখানো হলেও স্থানীয় শান্তিরহাট বাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সেখানে প্রহরী রয়েছেন মাত্র ২ জন।
এছাড়া “উপস্থিত কার্ড ছাড়া” ২৫টি কার্ডের বিপরীতে ২৫০ কেজি চাল বিতরণের তথ্যও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, উপস্থিতি ছাড়া কার্ড বিতরণের যৌক্তিকতা কী—সে বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
‘দলীয় ও এসিল্যান্ডের রেফারেন্সে’ অতিরিক্ত কার্ড
প্রকাশিত তথ্যে আরও দেখা যায়, “দলীয় ও এসিল্যান্ডের রেফারেন্স” উল্লেখ করে ইকবাল মেম্বারের নামে অতিরিক্ত ৩০টি কার্ডের বিপরীতে ৩০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পরিষদের প্রশাসক ও এসিল্যান্ড দেবব্রত দাশকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পর তড়িঘড়ি হিসাব মেলানোর চেষ্টা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হওয়ার পর বন্ধের দিনেও ইউপি সচিব পরিষদে এসে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, এ সময় তাদের অসঙ্গতিপূর্ণ ও দায়সারা তথ্য দেওয়া হয়।
সরেজমিনে ওই সময় পরিষদের এজলাস কক্ষে পলিথিন মোড়ানো প্রায় ৪০টি চালের প্যাকেট দেখা যায়। পরে তিনটি এতিমখানায় ১৫টি চালের প্যাকেট বিতরণ করেন সচিব।
অনুসন্ধানে গিয়ে সাংবাদিক হেনস্থা
ভিজিএফ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হেনস্থার শিকার হয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক।
হেনস্থার শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন রাঙ্গুনিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের দর্পণ প্রতিনিধি মোহাম্মদ মন্জুরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী। অভিযোগ রয়েছে, তথ্য সংগ্রহ ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য নিতে গেলে তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয় এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় রাঙ্গুনিয়া প্রেসক্লাব এক বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব পালনে বাধা ও হেনস্থা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। সংগঠনটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
“গরিবের হক নষ্ট করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত সম্ভব নয়”
স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, সরকারের দেওয়া ভিজিএফের চাল মূলত অসহায়, নিম্নআয়ের ও দুস্থ মানুষের জন্য বরাদ্দ করা হয়, যাতে তারা উৎসবের সময় সামান্য হলেও স্বস্তি পায়।
তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ভিত্তিতে কার্ড বিতরণ করা হলে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন,
“গরিবের হক নষ্ট করে কোনোভাবেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সরকারের মানবিক সহায়তা যেন প্রকৃত দরিদ্র মানুষের ঘরে পৌঁছায়, সেটিই প্রশাসনের দায়িত্ব হওয়া উচিত।”
সচেতন মহলের দাবি, গত ৫ আগস্টের পর দুর্নীতি ও লুটপাটমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এ ধরনের ঘটনায় তা আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তারা অবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।








